Wednesday, 8 June 2016

শিশু মন

সকাল সকাল উঠে তৈরি হয়ে ছুটে ছুটে বাস ধরি ভিড় বাসে বসার জায়গা খুঁজি। ট্রাফিকে পড়ে পনের মিনিটের রাস্তা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে অতিক্রম করে, শেষে বাস থেকে নামার সময় কন্ট্রাক্টরের সাথে টাকা ফেরত নেওয়া  নিয়ে এক চোট হাওয়ার পর শেষমেশ বাস থেকে নেমে পড়লাম নিজের গন্তব্যে এরও পর প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে তবেই আমার নতুন অফিস আগের অফিস বাসা থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ ছিল মায়ের সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে অফিস যাওয়া আর বাড়ী ফেরা, এই ছিল আমার প্রতিদিনের রুটিনের অংশ সেটা এখনও বজায় আছে বাস থেকে নেমেই মাকে ফোন করি বাবাকে সাধারণত বাসে ওঠার আগেই করি সেদিন বাবার সাথে কথা বলতে বলতেই ব্যাল্যান্স শেষ হয়ে গেল বাস থেকে নেমে মাকে আর ফোন করা হল না একা হাঁটতে ভীষণ খারাপ লাগে আমার ফোনে কথা বললে আর নিজেকে একা লাগে না  

বাস থেকে নেমে এই টুকু পথ হাঁটতেই আমার হাঁফ ধরে যায় অফিস পৌঁছে লিফটে চড়ে সোজা চলে যাই টপ ফ্লোরে এসেই ল্যাপটপের ব্যাগটা কাউচে ফেলে খোলা জানালার সামনে দাঁড়াই সকালের ঠাণ্ডা হাওয়া ঘামে ভেজা মুখে এসে লাগে রোজ জানালার বাইরে দেখি এত ওপর থেকে দুর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা শহরটাকে দেখা যায় নানান রঙের ছোট বড় মাঝারি মাপের বাড়ি  ঘর কোথাও কোথাও সবুজের একটু ছোঁয়া এত বড় কংক্রিটের শহরে এইটুকু সবুজ যেন , কোন খরস্রোতা নদীর বুকে দু এক টুকরো কচুরি পানা এই নদীর স্রোতের সাথে লড়ায়ই করে ভেসে থাকাটাই বড় ব্যাপার । রোজ হাজার হাজার মানুষ এই লড়াইয়ে যোগ দিচ্ছে । কেউ খড় কুটো ধরে ভেসে চলেছে , কেও না তলিয়ে যাচ্ছে ।  এই সব ভাবতে ভাবতে  হঠাৎ চোখ গেল কিছু দুরের একটা বাড়িতে   বাড়িটা আর আমার অফিস এর মাঝে আছে অন্য একটা বাড়ি আর একটা রাস্তার ব্যবধান  

বাড়িটা চারতলার খোলা বারান্দায় এক স্ত্রী তার স্বামীর সাথে কথা বলছে স্ত্রীর গায়ে ঘরোয়া পোশাক আর স্বামী ধোপদুরস্ত প্যান্ট শার্ট পরে আছে দুজনে যেখানে দাঁড়িয়ে , তাদের ঠিক পেছনে একটা জানালা ,সেই জানালার ওপারে আরও কেউ কেউ আছে মনে হচ্ছে একটা ছোট্ট বাচ্চা , আর এক বয়স্কা মহিলা এবার ভদ্রলোক  তার স্ত্রীর থেকে নিজের কালো ল্যাপটপ ব্যাগটা নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন  প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলো একটা ছোট্ট মেয়ে বয়স দুই এর বেশি হবে না এসেই প্রথমে সে তার মাকে জড়িয়ে ধরল, তারপর সে সিঁড়ির দিকে যেতে চাইল ওমনি তার মা তাকে তাড়াতাড়ি ধরে ফেলল বারান্দাটা লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা সেখানে লাইন দিয়ে ছোট ছোট টবে চারা গাছ লাগানো তারই একটা সরিয়ে দিয়ে মেয়েকে রেলিং ধরিয়ে দিল মা সাথে নিজেও দাঁড়াল, মেয়ের দুটো হাতে হাত রেখে দুজনের দৃষ্টি নিচের রাস্তার দিকে আমি গাছপালার জন্য নিচের কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম  না বে মা মেয়ের মুখে হাসি দেখে  বুঝলাম, মেয়েটার বাবা নিচ থেকে তাদের কিছু বলছে সারাদিনের মত বিদায় জানাচ্ছে, আবার দেখা হবে সেই সন্ধ্যে বেলা বা হয়তো রাতেমেয়ে হয়তো ঘুমিয়ে পড়বে তখন ছোট্ট হাত নেড়ে টাটা করল সে , তার পর ঘাড় বাঁকিয়ে বাবার চলে যাওয়া দেখল ততক্ষণ ওরা ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো যতক্ষণ তার বাবাকে দেখা যাচ্ছিল এর পর মা টবটা যথাস্থানে রেখে মেয়েকে নিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেল    

এই দৃশ্য আমাকে মনে করিয়ে দেয় এক কাল্পনিক স্মৃতি কাল্পনিক বলছি কারন, দৃশ্য আমি নিজের স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে পাইনা বার বার একই গল্প শুনে শুনে নিজের মত করে এই স্মৃতি তৈরি করেছে আমার মন মস্তিষ্ক এই স্মৃতি এত উজ্জ্বল যে,  ভাবলেই মনে হয় আমি সব দেখতে পাচ্ছি কংসাবতী নদীর তীরে এক মা তার ছোট্ট মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে, বাবা যাচ্ছে কাজে বাবার সাথে যাওয়ার জন্য মেয়ের চোখ ভরা জল  বাবার সাথে যাবে বলে সে মাকে সাজিয়ে দিতে বলেছিল  মা ভাল জামা জুতো পরিয়ে , চোখে কাজল লাগিয়ে দিয়েছিল , তাও যাওয়া হল না চোখের জলে তার কাজল মুছে গেল  অভিমানে চোখ ভরা জল নিয়ে সে মাকে জিজ্ঞেস করলযদি যাবইনা, তো আমি এত করে সাজলাম কেন’ ?  

আজ এই বহুতল বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে দুটো ছবি একসাথে দেখি, পার্থক্য করতে পারিনা সেই অতীতের আর আজ এই বর্তমানের দুই শিশুর নুভুতির মধ্যে দুজনেই তাদের বাবার চলে যাওয়া দ্যাখে দুজনেই বাবার সাথে যেতে চায় দুজনের মা তাদের সামলে রাখে কেউ বাহুতলের পর থেকে পাকা রাস্তার মোড়ে তার বাবাকে মিলিয়ে যেতে দ্যাখে , কেউ বা নদীর বাঁকে কেউ হয়তো গাড়িতে ভয় পায় , কেউ ভুটভুটিতে (মেশিন চালিত ছোট নৌকা) 

অগ্রগতির চাকার তলায় চাপা পড়ে ছোট  ছোট কতো  গ্রাম, আর  অত্যাধুনিক  প্রযুক্তির  মধ্যে দিয়ে সেই গ্রাম থেকে  জন্ম নেয়  শহর  নদী শুকিয়ে মাঠ হয়, কালো চুল সাদা হয় , কালের নিষ্ঠুরতায় সেই শিশু একদিন বড় হয়ে যায় সময়ের প্রবল  স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে সব শুধু নিয়ে যেতে পারেনা আমাদের নুভুতি , আবেগ , ভালবাসাকে সেই আদিম থেকে আধুনিক, সব মানুষের মধ্যে সেগুলো অপরিবর্তিতই থেকে গেছে মানুষের বয়স বাড়া সাথে সাথে যা হয় কিছু মার্জিত , কিছু সংযত, কিছুবা সযত্নে লুকিয়ে রাখা কোথাও অভিযোগের আড়ালে ভালবাসা প্রকাশ পায়, কোথাওবা ভালবাসা আড়ালে অভিমান   যদিও এসব আজও আমাদের মধ্যে সমান ভাবে বর্তমান, তবু আজ মানুষের সৃষ্টির কোটি কোটি বছরের পরেও শিশু মন একই রয়েগেছে, নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক, অবুঝ ও উদার সে তার মনের ভাব এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগেও গোপন করতে পারে না সৃষ্টির আদিকালের মতোই , ভাষা ছাড়াই অবলীলায় সে চিনে নিতে পারে আপনজনের স্নেহ ভালোবাসা, প্রকাশও করতে পারে সমান ভাবে ।

মৌমিতা সাহু
ব্যাঙ্গালোর,  ০৮/০৫/২০১৬




Thursday, 12 May 2016

Last Speech

A company is like a Tree. From the root to the leaf each part of a tree has its own different and very specific responsibility, which doesn't depend on the size of the tree.
We should not compare a banyan tree with a coffee plant. The reason and the way they serve this planet are totally different.
There are chances that the big trees can be toppled in high winds, which may not be able to destroy the small ones, but during the flood the scenario may change.
The very important person in this story is Gardener, who always takes care of the plants. Gardener only does things which are good for the plants. Starting from sowing the seeds, watering, spraying medicines, cleaning, cutting, until decorating them. The only aim is to make a 3 leaved plant into a big tree, with full of green leaves, strong long root and an unbreakable stem.
A new tree may start growing from any part of the Mother tree. It can be seeds, branches, leaves, even from roots.
Sometime, gardener cuts the branches or roots, for better growth of the plant. Sometime it happens for some other reasons. But, that does not kill the mother tree. It survives with new fresh leaves and branches. It also does not mean that the broken part will be destroyed. It always tries to revive with a new identity, in a different weather and environment.  

But, the broken part can never forget from where it learned to be alive, how to be patient during the summer, how to navigate in high wind, even how to enjoy the monsoon. 

Moumita Sahu
12-05-2016, Bangalore

Saturday, 30 April 2016

অবাঞ্ছিত

এই যে সব আগাছার দল,
গজিয়ে উঠেছ নিয়ে দলবল ।
জানোনা এটা আমার উঠোন,
নয়তো কোন পুরনো দালান ।

আমার উঠোনে ফুলের বাহার,
বাহারি পাতাও আছে থরে থর ।
তোমারতো শুধুই পাতা সম্বল ,
না আছে ফুল না আছে ফল ।

লতাপাতা, বলে না কিছু ।
লজ্জাবতী বলে, করে মাথা নিচু ।
এটাই আমার দেশের মাটি,
উপড়ে দিলেও আবার বাঁচি ।
চাইনিতো সেবাযত্ন তোমার ,
আঁকড়ে থাকি মাকে আমার ।

তুমি কি জানো,
যখন তোমার শিশু কাঁদে,
কাজের মেয়েটা ভোলায় তাকে ।
কি করে জানো ?
আমার কাছে আনে তাকে,
সবুজ পাতায় হাত বোলাতে ।
কচি হাতের স্পর্শ পেয়ে ,
আমার পাতা যায় গুটিয়ে ।
তাই না দেখে শিশু তোমার ,
খিলখিলিয়ে হাসে আবার ।
তোমার ঐ বাহারি পাতা পারে ,
আমার মতো মন ভোলাতে ?

নাও নাও এবার উপড়ে ফেলো ,
বেকার কথায় দেরি হোল ।
তুমি আমায় শেষ করলেই ,
আবার শুরু করতে হবে ।


Moumita Sahu
30th April 2016, Bangalore

Wednesday, 20 April 2016

মনবাজারে খরিদ্দারি

মনবাজার নামে এক জায়গায় বেশ খানিক জায়গা জুড়ে একটা বাজার বসে । সেখানে ভালোবাসা, রাগ, দুঃখ, হিংসা, যন্ত্রণা, সাধ আহ্লাদ, আভিমান, হ্যাংলামি, লজ্জা শরম সব সব কেনা বেচা হয় । ছেলে মেয়ে বুড়ো বুড়ি বৌ বর সবাই আসে সেখানে খরিদ্দারি করতে । সেই বাজারে এক বিক্রেতা আর তার কিছু ক্রেতাদের কথোপকথন এই লেখার মুল বক্তব্য ।


বিক্রেতা  - ৫০০ টাকা কিলো, ৫০০ টাকা কিলো । টাটকা তাজা মিষ্টি খাঁটি ভালোবাসা মাত্র ৫০০ টাকা কিলো ।


প্রথম ক্রেতা - (চোখ বড় বড় করে, অবাক কণ্ঠে)৫০০ টাকা , বল কিগো ভাই । গলা কেটে নেবে নাকি ভালবাসার জন্য ।


বিক্রেতা - কি করব বলুন দাদা , বসন্ত কাল পড়েছে, ভালবাসার সিজিন তো , তাই দামটা একটু চড়ার দিকে । কিন্তু আপনি কোয়ালিটিটা একবার দেখুন । একটা কণাও ভেজাল ভালোবাসা পাবেন না । একটুকরা নিয়ে এখানেই কাউকে দিয়ে টেস্ট করে দেখুন না ।


প্রথম ক্রেতা - আরে বাবা টেস্ট করে কিনতে হলে কি আর অন্য কারো কাছে যেতে পারতাম না ? তোমার জিনিসে বিশ্বাস আছে বলেই না সোজা তোমার কাছে এসেছি । নইলে বাজারে কি আর দোকান নেই । তোমার বৌদি বেরনোর সময়ই বলে দিয়েছে , যেন তোমার থেকেই ভালোবাসা নিয়ে যাই ।


বিক্রেতা -(খেক খেক করে হেসে) বৌদি ভালো আছেন তো ? নিয়ে যান না দাদা , যতো খুশি নিয়ে যান , বলেন তো আমার ছেলে কে দিয়ে আপনার বাড়ি পৌঁছে দিই । কতো দেব দাদা ?


প্রথম ক্রেতা - সে ঠিক আছে , কিন্তু তুমি দামটা বড্ড বেশি বলছ ভায়া । ঠিক করে দাম বলো আগে ।


বিক্রেতা - আপনাকে কি আর বলি । কিলোতে ১০ টাকা কম দেবেন । (অন্য ক্রেতা দের ভালোবাসা ওজন করে দিতে দিতে) ভালো জিনিস তো, এখুনি শেষ হয়ে যাবে ।


প্রথম ক্রেতা - ৪৯০ টাকা কিলো । পারবো না ভাই , ছেড়ে দাও । এ সপ্তাহ তাহলে ভালবাসা ছাড়াই চালাতে হবে দেখছি । দেখি অন্য দোকানে কি পাওয়া যায় ।


বিক্রেতা - আরে দাদা , চললেন কোথায় । কতো দেবেন তো বলুন ।


প্রথম ক্রেতা - ৪৫০


বিক্রেতা - মরে যাব দাদা , এক দম মরে যাব । অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি । আপনি ৪৮০ করুন । (এই বলতে বলতে সে ২ কেজি ভালোবাসা প্যাক করতে লাগল )


প্রথম ক্রেতা - আরে আরে, করো কি কারো কি । ২৫০ গ্রাম দাও । ১২০ টাকা হয় তোমার কথা মতো । ১০০ দিলাম, এই নাও ।


বিক্রেতা - নির্বাক ।


প্রথম ক্রেতা - আরে ভায়া , শেষ বার ভালোবাসা নিলাম তোমার থেকে , ২৫০ গ্রামই নিয়েছিলাম । এতো ভালো ছিল ভালোবাসাটা, অল্পেই কাজ হয় । ছেলে মেয়ে বৌ বাবা মা সবাই খুশ । এখনও বাড়িতে কিছুটা আছে । থাকতে থাকতেই নিয়ে যাওয়া ভালো, নাকি বল ।


বিক্রেতা - (নিরাশ গলায় ) হ্যাঁ হ্যাঁ


(প্রথম ক্রেতা চলে গেলেন । বিক্রেতা আবার হাঁক ডাক শুরু করলো) ৫০০ টাকা কিলো, ৫০০ টাকা কিলো । টাটকা তাজা মিষ্টি খাঁটি ভালোবাসা মাত্র ৫০০ টাকা কিলো ।


দ্বিতীয় ক্রেতা - দাদা , দিনতো ৫ কেজি ভালোবাসা ।


বিক্রেতা -(চোখ মুখ থেকে আনন্দ ঠিকরে পড়ছে । ৩২ টা দাঁত দেখানোর চেষ্টা করে বলল) ৫ কেজি? এতো ভালোবাসা কি হবে ভাইটি ? কোন অনুষ্ঠান আছে বুঝি ।


দ্বিতীয় ক্রেতা -(টাকা গুনতে গুনতে)আরে না না । নতুন বিয়ে করেছি তো তাই । এখনই তো ইনভেসট করার সময়, তাই না ।  এই নাও তোমার টাকা । চলি দাদা ...


বিক্রেতা - নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই । (দ্বিতীয় ক্রেতা চলে গেলেন । বিক্রেতা আবার হাঁক ডাক শুরু করলো একই সুরে) ৫০০ টাকা কিলো, ৫০০ টাকা কিলো । টাটকা তাজা মিষ্টি খাঁটি ভালোবাসা মাত্র ৫০০ টাকা কিলো ।


তৃতীয় ক্রেতা - এই যে ভাই ভালোবাসা দোকানি ।


বিক্রেতা - বলুন বাবু কতো দেব ? কেজি দুয়েক দিই? কুড়িয়ে বাড়িয়ে আর কেজি ৩ হবে । আপনি যদি ২ কেজি নেন তবে এখনকার মতো গুছিয়ে ফেলি ।


তৃতীয় ক্রেতা - আরে দাঁড়াও দাঁড়াও । এতো তাড়া কিসের তোমার । আমি তো এলাম তোমার সাথে গল্প করতে । এখনই ফিরবে ?


বিক্রেতা - আর দাদা যা গরম পড়েছে , বাড়ি ফিরে একটু বিশ্রাম করব । আবার তো বিকেলের ব্যাবসা আছে ।যতো তাড়াতাড়ি সব ভালোবাসা বিক্রি হয়ে যায় ততো ভালো । নাহলে এতো কষ্ট করে জোগাড় করা ভালোবাসা সব এই গরমে পচে যাবে ।


তৃতীয় ক্রেতা - আচ্ছা দোকানি , তোমার কাছে কি শুধুই ভালোবাসা পাওয়া যায় ? আর কিছু নেই ?


বিক্রেতা - নাহ, আর কিছু নেই তেমন । আমি শুধু আসল ভালোবাসা বেচি । আপনার কি অন্য কিছু চাই বাবু ?


তৃতীয় ক্রেতা - নাহ । আমার কিছু চাই না । শুনেছি রাগ আভিমান হিংসা লোভ এই সবে মুনাফা আনেক বেশি ।


বিক্রেতা - হ্যাঁ বাবু, দাম তো আছে । কিন্তু আমার মন চায়না বেচতে । আমি সেই ছোট্ট থেকে বাবার সাথে ভালবাসাই বেচি । বাবার মৃত্যুর সময় বাবাকে কথা দিয়েছিলাম , অন্য কিছু বেচব না । 


তৃতীয় ক্রেতা - হুম বুঝলাম । তা কোথায় পাও তুমি এতো খাঁটি ভালোবাসা ? জান, আমি অনেক দুর থেকে আসছি তোমার সাথে দেখা করব বলে । শুধু জানব বলে কোথায় পাও তুমি এতো সুন্দর ভালোবাসা । শুনেছি তোমার মতো ভালোবাসা আর কেও দিতে পারে না । 


বিক্রেতা - সে তো সবাই জানে বাবু । আমি বন জঙ্গল , পশু পাখী , জল নদী বাতাস এই সব থেকে ভালোবাসা পাই । তাই বেচি ।


তৃতীয় ক্রেতা - সে তো শুনছি অন্যের মুখে । কিন্তু কেউ নাকি বিশ্বাস করে না । সবাই বলে তুমি নাকি মন্ত্র যান ।


বিক্রেতা - না বাবু , আমি কোন মন্ত্র জানি না । আমি রোজ আমার বাড়ির গাছ গুলোতে জল দিই । গরুটাকে খেতে দিই , তার গলায় হাত বুলিয়ে দিই । বেড়াল ছানাটাকে আমার ভাগের দুধ মাছ দিই । কুকুরটাকে খেতে দিই । পুকুরে শুকনো পাতা বা আবর্জনা হলে সাফ করি । এরা তার বদলে আমাকে অনেক ভালোবাসা দেয় । সত্যিকারের ভালোবাসা । যা পাই তাতে আমার পরিবারের সবার চাহিদা মিটে যাওয়ার পর যা বাঁচে, তাই তো আমি বেচি । সবাই যদি এসব করে তবে আর কাউকেই ভালোবাসা বাজারে কিনতে হবে নাসবাই এমনিই খুশি থাকবে ।


তৃতীয় ক্রেতা - (হালকা একটু হেসে) ঠিক বলেছ তুমি । এবার উঠি গো দোকানি । দাও তোমার যেটুকু ভালোবাসা আছে সব ব্যাগে ভোরে দাও । আর একটু কষ্ট দিও তো সাথে ।


বিক্রেতা -(ভালোবাসা ব্যাগে ভরতে ভরতে) এই নিন বাবু । আপনার মতো খুব কম লোকই ভালোবাসার সাথে একটু কষ্ট চায় । সবাই কে বলি না যে আমার কাছে কিছু কষ্ট আছে । যারা চায় তাদের দিই । টাকা নিই না । আপনি ভালোবাসার সাথে কষ্ট কেন নিলেন বাবু ? আর আপনি জানলেন কি করে আমার কাছে কষ্ট আছে ?


তৃতীয় ক্রেতা - (হালকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ) এ এক বিলাসিতা হে । কষ্ট ছাড়া ভালোবাসা , অনেকটা ওই রায়তা ছাড়া বিরিয়ানি বা কাসুন্দি ছাড়া চিকেন কাবাবের মতো , কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে বুঝলে । আর কি করে জানলাম তোমার কাছে কষ্ট আছে, সে না হয় অন্য একদিন বলবো । আজ চলি হে ... (বলেই চলতে শুরু করলেন)


বিক্রেতা -(কিছুক্ষণ হ্যাঁ করে তাকিয়ে থেকে, হঠাৎ প্রায় চিৎকার করে বলল) আবার আসবেন বাবু । 




মৌমিতা সাহু
20/04/2016, ব্যাঙ্গালোর



Wednesday, 16 March 2016

৫১বর্তী



মা বলে আমার যখন এক বছর নয় মাস বয়স তখন আমরা দেশের বাড়ি ছেড়ে বাবার চাকরির জায়গায় চলে এসেছিলাম । আর তখন থেকেই আমার পৃথিবী মানে আমি আমার মা আর বাবা । তার কিছুকাল পর সেই পৃথিবীতে আর এক সদস্য যোগ দিয়েছিল, আমার ভাই । পারিবার বলতে যা বোঝায় তা মোটামুটি এর মধ্যেই সীমিত । রক্তের সম্পর্কের মানুষই যে আপন, না হলে পর তা বিশ্বাস করার শিক্ষা আমি ছোট থেকে পাইনি । তবে আপনজন আর পরিবার দুটো জিনিস কি এক? পরিবারের এমন মানুসজন থাকে যারা কোনদিনই আপনজন হয়ে উঠতে পারে না । আবার পরিবারের মানুষ না হয়েও অনেকেই আপনজন হয়ে যায় আনায়াসে । এই পরিবার আর আপনজন নিয়ে লিখলে হয়তো একটা গোটা বই লেখা যায় , যদিও আমার এখনও সেই যোগ্যতা হয়নি, তাও বুঝতে ঠিকই পারি । মানুষ যেমন পরিবারের জন্য আপনজনকে দুরে সরিয়ে দিতে পারে , তেমনি আপনজনের জন্য পরিবারেরও রক্ত ঝরাতে পারে । আমার বাবা , মায়ের অনেক ভাই বোন , তাদেরও অনেক ছেলে মেয়ে। সেদিক থেকে আমার পরিবার বেশ বড়সড় কিন্তু তা সত্যেও, আমি কখনো এতো বড় পরিবারের আপনজন হতে পারিনি । মনে হয়, বিশাল কোন বড় পুরনো গাছের তিন পাতার একটা ছোট্ট একটা ডাল কোন এক বিষম ঝড়ে ভেঙ্গে অনেক দুরে গিয়ে পড়েছে । আর সেই ডাল থেকে আবার নতুন গাছের জন্ম হয়েছে । এখন সেই গাছের চারটা পাতা, কিন্তু একটাই প্রান । এমনি হাজার ছোট বড় গুল্ম, লতা, বৃক্ষের মাঝে আমাদের ছোট্ট নতুন প্রানকে সজীব সতেজ সুন্দর ও স্বাস্থবান রাখার প্রচেষ্টা চলছে ।
আমাদের বাড়ির আশেপাশে অনেক যৌথ পরিবারের বাস ছিল, এখনও আছে । তাতে কতো ভাই বোনেরা বড়ো হয়ে উঠেছে একসাথে । তাদের দেখে আমার মনে হতো, আমরাও যদি একসাথে থাকতাম কতো ভালো হত বড় হতে হতে আরও বুঝলাম এই সব পরিবার আর সব পরিবারের মতোই । একসাথে থেকেও এরা কেউ কারো আপনজন হয়ে উঠতে পারেনি । ধিরে ধিরে আমার বিশ্বাস হতে শুরু করেছিল , এই পৃথিবীতে এমন কোন একান্নবর্তী পরিবার নেই, যারা শুধু একই অন্নেই নয় প্রকৃত অর্থেই একত্রে সুখে বসবাস করছে । এই বিশ্বাস আমাকে এই অভাব বোধ থেকে খানিক মুক্তি দিয়েছিল । মনে হত, এত বড় পরিবারের সাথে থাকলে হয়তো এত স্বাধীনতা পেতাম না, এই বেশ ভাল । পরিবার পুরো না থাকলেই বা , আপনজনেরতো আভাব নেই । এই আপনজনেরাই পারিবার । শুধু দ্বিধা বোধ করি যখন কেউ পরিবারের ব্যাপারে প্রশ্ন করে । বাবার কজন ভাই বোন , কি করে, কোথায় থাকে , এই পর্যন্ত তাও ঠিক থাকে । কিন্তু সমস্যা হয় পরের প্রশ্নে, কাকা, পিসি এদের ছেলে মেয়ে কতো জন, তারা কতো বড়ো, তাদের নাম কি ? মুশকিলে পরে যাই আমি । ছেলে মেয়ে কতো জন জানি , তবে তাদের নাম আর কে কোন ক্লাসে পরে, এতো সব আমি জানি না । এমন তুতো ভাইও আছে যাকে আমি কখনো চোখেই দেখিনি । সে যাই হোক, কোন ভাবে এই সব অস্বস্থিকর প্রশ্নের ভাসা ভাসা উত্তর দিয়ে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করিতখন মনে হয়, আমার পারিবারের লোক জন আপনজন না হোক, পারিবার হিসেবে থাকলেও ঠিক ছিল । পরিবারের লোকজন এখন শুধুই দুঃসম্পর্কের মানুষ । যারা কিছু সামাজিকতা , নিয়ম কানুন আর দায়ব্ধতার জন্যই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ অনুভব করে । যারা না আপনজন, না পরিবার , শুধুই অপ্রয়োজনীয় তিক্ত রক্ত সম্পর্ক । পরিবারের সাথে সম্পর্ক ত্যাগের জন্য নেহাত কোন যথাযথ বিচ্ছেদ আইন নেই । তা নাহলে এই সামাজিক প্রয়োজনীয়তা টুকুও পড়ত না । তবে পরিবার আর আপনজন নিয়ে ভিন্ন মনোভাব থাকলেও, আমি একদিন এমন এক পরিবারের সাথে খুব স্বল্প সময়ের জন্য সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলাম, যার পর আমার চিন্তা ভাবনার কিছু পরিবর্তন ঘটেছে    
যদিও আমি এখন একজন কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ার , তবে এটা পূর্বপরিকল্পিত মোটেই না । সময়ের সাথে সুযোগ আর বাবা, মা, শিক্ষক ও বন্ধুদের সাহায্য মিলিয়ে আজকের এই পরিচয়ের জন্ম । লোকজন সাধারণত উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর নিজের পছন্দ মতো বা পরিবারের উপদেশ মতো ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডাক্তারির জন্য প্রস্তুতি নেয়, কোচিং নেয় । আমার ছোট থেকে বরাবরই অঙ্ক ভীষণ ভালো লাগে । অঙ্ক , ধাঁধা এই সব সমাধান করতে আমার বড়ো ভাললাগে । ছোট থেকে অঙ্ক ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে পড়ার কথা ভাবিনি । তাই যেখানে যা অঙ্কের পরীক্ষা হত , তাই দিতাম । ফল সব সময় ভালো হত তা নয়, তবে তাতে আমার উৎসাহ কম হত না । এই উৎসাহ এখনও থাকলেও , ক্লাস ইলেভেন টুয়েলভ এ বুঝেছিলাম, ভালোলাগা কেই ভবিষ্যৎ বানানো ঠিক হবে না । ভবিষ্যতের জন্য এমন কিছু চাই, যা আমার ভালোও লাগে আর সামলানোও যায় বেশি ভাবতে হল না, দ্বিতীয় যা ভালো লাগে তা হল, বায়োলজি। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে মোটামুটি খুশিতেই আছি । যদিও বাবার উপদেশে ডাক্তারির জন্য পরীক্ষা দেব বলে ফর্ম ভরেছি, তবে, আমি প্রায় নিশ্চিত ছিলাম যে, আমি বায়োলজি নিয়েই পড়ব । তাই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম নিজে নিজেই । 

দেখতে দেখতে পরীক্ষার দিন এসে গেল । পরীক্ষার সিট পড়েছে বাড়ি থেকে প্রায় ষাট সত্তর কিলোমিটার দুরে । পরীক্ষার আগের দিন দুপুরের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে বাবার সাথে বেরিয়ে পড়লাম । সাথে রাতের পোশাক, গামছা, ছিরুনি, ব্রাশ, কোলগেট আর তিনটি পাতলা পাতলা প্রশ্ন উত্তরের বই, পেন, পেনসিল আর পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড । বাবা আমাকে নিয়ে গন্তব্যস্থলে যখন পৌঁছলেন তখন বেলা তিনটের বেশি । বাস থেকে নেমে, এদিক ওদিক দেখে একটা দোকানের সামনের ব্রেঞ্চে আমাকে বসিয়ে জিনিসপত্র রেখে বাবা বেরোলেন রাত কাটানোর জায়গার ব্যাবস্থা করতে । দুরে কিছু ছোট খাটো হোটেলের নাম দেখা যাচ্ছেবসে রইলাম, বাবা ফেরার অপেক্ষায়প্রায় মিনিট চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ পর বাবা ফিরে এলেন । ঘামে ভিজে গেছেন, মুখটা বিকেলের রোদে পুড়ে আরও কালো দেখাচ্ছে । বাবা হতাশ হয়ে জানালেন, কোন হটেলেই একটাও ঘর খালি নেই । তাহলে কি হবে এখন? বাবাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল । মনে হল বলি ‘ফিরে চলো বাবা’ । কিন্তু সাহস হচ্ছিল না । কি করি কি করি এমনি ভাবছেন , এমন সময় রাস্তার ওপারের একটা সাইকেল দোকানের দিকে বাবার নজর গেল । বাবা বেশ খুশি হয়ে , বললেন, ‘আয় আমার সাথে’ । দোকানে এক ভদ্র লোক একটা সাইকেল মেরামত করছিলেন । বাবা কে দেখে প্রায় জড়িয়ে ধরলেন । দুজনের এতো খুশি দেখে বুঝলাম, অনেক দিন পর দুই আপনজনের দেখা হয়েছে । ভদ্র লোক বাবাকে চা ও আমাকে মিষ্টি খাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন । বাবা বললেন, ‘সে সব হবে পরে । আমার একটা উপকার করতে পার ?’ ভদ্র লোক বললেন ‘বলুন না, কি করতে পারি ।’ বাবা বললেন ‘মেয়ের পরীক্ষা । তাই এখানে এসেছি । কিন্তু কোন হটেলেই জায়গা নেই । এখানে যদি কোথাও থাকার ব্যাবস্থা হয় । একরাতের জন্য ! যা টাকা হয় দেব । মেয়েকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেছি ।’ ভদ্র লোক বললেন ‘আপনি এখানেই বসুন । আমি দশ মিনিটে ঘুরে আসছি।’ এই বলেই তিনি চলে গেলেন । ফিরে এলেন আর একজন ভদ্র লোককে নিয়ে । তাঁদের বাড়িতেই সে রাতের জন্য আমাদের থাকার ব্যাবস্থা করেছেন । বললেন, “এদের অনেক ভাই, সবাই একসাথে থাকে । বাড়িতে অনেক লোকজন, আমার বয়সী মেয়েরাও আছে । তাই ভয়ের কিছু নেই ।” ভদ্র লোক এত কিছু ভেবেছেন ভেবে আমাদের কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা থাকলো না ।
বাজার থেকে ভদ্র লোকের বাড়ি যাওয়ার জন্য যখন যাত্রা শুরু করলাম তখন সূর্য অস্ত যায় যায় । পশ্চিম আকাশ সিঁদুরে সেজে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালাতে তৈরি । সেই রাঙা আকাশকে সামনে রেখে এগোচ্ছিলাম । এরকম রাস্তায় যাওয়ার সে ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা । এবার দেখলাম, নদীর বাঁধের মতো অনেক উঁচু দিয়ে রাস্তা । তার দুই দিকে লাল টালির ছাওয়া বাড়ি । অনেক নিচুতে বাড়ি গুলি । ওপর থেকে বাড়ির দেওয়াল দেখা যায় না । ঘন গাছপালায় ঘেরা বাড়ি গুলোর লাল টালির চাল (ছাদের চলতি বাংলা) ঠিক যেন বড় বড় কোন লাল জংলী ফুল । প্রায় সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময় আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছলাম । যে বাড়িতে আমরা থাকব, সেটি পাকার, বাকি গুলো সব মাটির, টালির ছাদ, রাস্তায় দেখা বাড়ি গুলোর মতো । বাড়ির ভেতরে এসে দেখি এক মাঝারি উচ্চতার বছর চল্লিশের একজন মহিলা সাথে বছর একুশ বাইশের একটি মেয়ে, আসুন আসুন করে আমাদের আপ্যায়ন করে ভেতরে নিয়ে গেলেন । মুখের গড়ন, চেহারায় মিল দেখে বোঝা যায় এঁরা মা মেয়ে । প্রথম মনে হল কি করে জানলেন, আমরা আসছি। পরে মনে হল, টেলিফোন করে দিয়েছিলেন হবে । প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আরও দেখে অবাক হলাম এই যে , আরও তিন চারটি বড় ছোট মেয়ে হাজির হয়েছে আমাদের আশেপাশেআমাকে দেখে বলল “তুমি আমাদের সাথে যাবে?” । আমি কি বলব ভেবে পেলাম না ভদ্র মহিলা, তাদের ধমক দিয়ে বললেন , “এই এসেছে , স্নান করে কিছু খেয়ে একটু বিশ্রাম নিতে দে। তোরা যা এখন ।” তাদের মধ্যে একটা বছর বার তেরর মেয়ে আমার হাত ধরে বলল, “আমি একটু পর এসে তোমাকে নিয়ে যাব ।” দরজার বাইরে একটা দুরের ঘর দেখিয়ে বলল “ওই ঘরটায় । তুমি যাবে তো? সবাই তোমার সাথে পরিচয় করবে বলে আপেক্ষা করছে”আমি কিছু বলার আগেই সে দৌড়ে পালাল । ছাদের একটা সুন্দর ঘরে আমাদের থাকতে দেওয়া হল । প্রথমেই স্নান সেরে নিলাম । কিছু খেয়ে বাবা কে জিজ্ঞেস করলাম, একটু ঘুরে আসব কি না । বাবা বললেন, “যা ঘুরে আয় , আমি একটু বিশ্রাম করিরাতের খাওয়ার সময় ডাকিস ।” নিচে নেমে এসে দেখি , সেই ছোট্ট মেয়েটা এসে গেছে । আমি বাড়ির ভদ্র মহিলাকে বললাম “কাকিমা আমি একটু ঘুরে আসি ?” উনি রান্না চাপাতে চাপাতে বললেন , ‘এসো’। আর ছোট্ট মেয়েটাকে বললেন ‘বেশিক্ষণ আটকে রাখবি না । কাল পরীক্ষা আছে । আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমবে ।’ মনে হল আমার মা যেন ওনাকে সব শিখিয়ে দিয়েছেন । বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখি চারিদিক নিঃঝুম । কেউ কোথাও নেই । সব বাড়ির বাইরে একটা করে বাল্ব জ্বলছে । একটা বাড়ির বারান্দা পেরিয়ে , আর একটা বারান্দা দিয়ে অন্য একটা ঘরে পৌঁছলাম । আয়তাকার ঘরের একদম শেষে একটা খাট , অন্য চার পাশে নানা আসবাবে ভরা । টেবিল, চেয়ার , আলমারি ছাড়া হারমনিয়ামও ছিল একপাশে । সেই ঘরে একে একে সবাই এলছোট বড়ো এক গুচ্ছ মেয়ের দল । তার পর আমার একটা ছোটোখাটো ইন্টার্ভিউ হল কোথায় বাড়ি, কেন এসেছি , পরীক্ষার জন্য পুরোপুরি তৈরি কিনা , ভয় করছে কিনা । গান নাচ জানি কি না । কি খেতে ভালো লাগে । কি খেতে ভালো লাগে না । সিনেমা দেখি কি না । কার কোন সিনেমা । আর ও হাজারো প্রশ্ন । সঙ্গে সঙ্গে তাদের কার কি পছন্দ অপছন্দ তাও বলল । তাদের মধ্যে একজন বলল , “আমরা সব বোনেরা বেশিরভাগ সময় এই ঘরটাতেই থাকে”এদের মধ্যে সব চেয়ে যে বড়ো , তার নাম ‘মৌমিতা’ । ইংরেজিতে এম এ করছে । অন্যদের নাম মনে নেই । মনে হল, দুজন মৌমিতার জীবন একদম দুরকম । দুজনের বাড়ির পরিবেশ , বড় হয়ে ওঠা সব আলাদা, শুধু নামটাই এক । আমরা বাড়ি চলে আসার পরও আমাদের বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল এই মৌমিতাদি । আমাদের মধ্যে কেমন একটা সুক্ষ্ম টান তৈরি হয়েছিল, যা পরে কখন যে ছিঁড়ে গেছে টেরই পাইনি । সেদিন অনেক গল্প , হাসি ঠাট্টার পর খাওয়ার ডাক পড়তে ফিরে এলাম । এক সন্ধ্যায় আমি ওদেরই একজন হয়ে গেছিলাম ওরা সবাই আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেল ঘরেকেউ কেউ মন খারাপ করল , তাদের বাড়ি যাওয়া হল না বলে । ফিরে এসে বাবাকে ঘুম থেকে তুললাম । ডাল , ভাত , ডিম ভাজা , আলু ভাজা , সবজি দিয়ে রাতের খাওয়ার হল । মনেই হল না, বাইরে কোথাও খাচ্ছি । রাতে খুব ভালো ঘুম হল । সকাল সকাল উঠে স্নান সেরে তৈরি হয়ে গেলাম । ভাবলাম, এমনি বেরিয়ে যাব , কিন্তু কাকিমা ছাড়লেন না । বললেন ‘সারাদিনের পরীক্ষা, একটু গরম ভাত খেয়ে যাও’ । ভাত, ডাল, মাছের ঝাল খাওয়া হল । সেই মাছের ঝালের স্বাদ ঠিক মায়ের রান্না মাছের ঝালের মতো ছিল । বেরোনোর আগে আবার সবাই হাজির , সবার সে কী মন খারাপ । পরীক্ষা শেষে আমরা যেন আবার ফিরে আসি । অন্তত আর একটা দিন থেকে যাই । যদি, আজ ফিরে নাও আসি তবে যেন কথা দিই, আবার আসব । যোগাযোগ রাখব । যাদের বাড়িতে ছিলাম তাদের মেয়ে কলেজে থার্ড ইয়ারের ছাত্রি । আমরা স্বজাতি শুনে কাকিমা মেয়ের জন্য ভাল পাত্র দেখার জন্য বাবাকে অনুরোধ জানালেন । শেষে হাসি মুখে সবাইকে বিদায় জানিয়ে পরীক্ষা সেন্টারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিলাম ।

পরীক্ষা দিয়েছিলাম , ফল যে ভাল হয়নি সে তো সবাই বুঝতেই পারছেনডাক্তারি পরীক্ষা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি । ইঞ্জিনিয়ার হয়ে লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকি । আমাদের জীবনে সব কিছু পুর্বনির্ধারিত বা পুর্বপরিকল্পিত হয় না । আর স্থায়ীও হয় না । পছন্দ অপছন্দ, চিন্তা ভাবনা পাল্টায় । সিদ্ধান্ত পাল্টায় । মানসিকতা পাল্টায় । সমস্যা পাল্টায় । সমাধানের পথ পাল্টায় । জীবনের পথে এই আবিরাম পরিবর্তন আমাদের উপহার দেয় ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা । সে অভিজ্ঞতা কখন মধুর ,কখনও তিক্ত । সেই রাতে আমি পেয়েছিলাম একটা একান্নবর্তী পরিবার আর অনেক আপনজন, যারা একই অন্নে লালিত পালিত হয় না ঠিকই, একই ছাদের তলায় ও থাকে না , তবু তারা এক । আবার একই সাথে অন্য আর পাঁচটা পরিবারের থেকে কিছু আলাদা । আমি অন্তত সেই একটা রাতের জন্য সেই পরিবারের সদস্যের সাথে সাথে তাদের আপনজন হতে পেরেছিলাম এই উপলব্ধি আমাকে আজও বার বার সুখি করে । আর এই ভেবে আস্বস্থ করে যে , একান্নবর্তী না হলেও অন্তত একে অন্যের পাশে বর্তমানেও থাকা যায়।   

Moumita Sahu
16/03/2016                 
         

Sunday, 28 February 2016

মোতি

গরম কাল আমার বরাবরই পছন্দের কাল। শীত আমার কখনই ভালো লাগে না । এই ভাললাগা না লাগার অনেক কারন। শীতের রকমারি ফুল ফল সবজি যতই হোক, তার চেয়ে গ্রীষ্মের দুপুরের গরম বাতাসে ভেসে আসা আমের মুকুলের গন্ধ আমার বেশি প্রিয় । কনকনে ঠাণ্ডায় উষ্ণ জলে স্নানের চেয়ে, ভীষণ গরমে ঠাণ্ডা জলে স্নান ঢের বেশি আরামের । শীতকালে ভোর হয় দেরিতে , সন্ধ্যে হয় তাড়াতাড়ি । ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগে না আমার । ভরা গরমে সকাল স্কুল থেকে ফিরে , দুপুরে লম্বা ঘুম, তার পর বিকেলে সাইকেলে ঘুরে বেড়ানো , কখনো ক্রিকেট খেলা । আরও কতো কি । গরমে ঘামে ভেজা গায়ে টেবিল ফ্যানের সামনে বসে হাওয়া খাওয়ার মতো আরামের আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না । তাছাড়া আমার সব চেয়ে প্রিয় বিকেল শেষে হঠাৎ কালবৈশাখী । এই সবই পাই গরম কালে । মনে পড়ে এমনি কোন গরমের সন্ধ্যায় বাড়ির বাইরে মাদুরে বসে হারিকেনের সামনে পড়তে বসা । ছোট থেকে বড় হয়ে উঠতে উঠতে এরকম হাজারো ভাললাগার স্মৃতি জমে উঠেছে আমার মনের মণিকোঠায় । সেগুলো একদিন গুছিয়ে বলবো । সেদিক থেকে শীতের স্মৃতি বেশ কম । বেশি কিছু মনেই পড়ে না । শীত বললেই মনে হয় লেপ ছেড়ে বেরনোর কষ্ট, স্নান করে সুখ নেই, কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া, সারাক্ষণ সোয়েটার টুপি পরে থাকা আর রাতে খাওয়ার পর গরম উনুনের সামনে বসে হাত পা সেঁকা যা কিনা পাঁচ মিনিটে ঠাণ্ডা হয়ে যায় । আসলে ভালো না লাগলে, মনে কোন জিনিসই থাকে না। তাইতো মানুষ , অনেক টাটকা কষ্টের স্মৃতি ভুলে , তার চেয়েও পুরনো সুখের স্মৃতি মনে করে সুখে দিন কাটাতে পারে । তবে আজ আমি এক শীতের সন্ধ্যার একটা সুখের স্মৃতির কথা বলব।

সময়টা শীতের শুরুর দিকে । কোন এক রবিবারের দুপুর । তখনও আমি সাইকেল চালাতে শিখিনি । সেলুনে চুল কেটে বাবার সাইকেলের পেছনে আমি আর সামনে ভাই বসে বাড়ি ফিরছি । গ্রামের মোরাম রাস্তা ধরে বাবা ধিরে ধিরে সাইকেল চালাচ্ছেন। গ্রামের রাস্তা সাধারণত আঁকাবাঁকা হয় । সেই সব রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসার সময় আমি মোড় গুনতাম । পোস্ট আফিস, তার পর রেশন দোকান , তার পর ঝাড়ারবাড়ি , তারপরের মোড়ে একদিকে আমাদের বাড়ি অন্য দিকে কুমড়িদের বাড়ি । এই রেশন দোকান আর ঝাড়ার বাড়ির মাজে একটা পাড়া পড়ে । সেই পাড়ার পরে নাম হয়েছিল ‘নেতাজী সুভাষ পল্লী’ । তবে আমি যখনকার কথা বলছি তখন কোন বিশেষ নাম ছিল না । আমরা যখন সেই পাড়ার কাছাকাছি এসেছি, হঠাৎ দেখি একটা ছোট্ট সাদা বলের মতো কুকুর ছানা থুপ থুপ করে গলির রাস্তায় ঢুকছে । পাড়ার প্রথম আর দ্বিতীয় বাড়ির মাঝে সে যোগ দিল তার মা আর ভাই বোনদের সাথে । বাবা সাইকেলটা আরও ধিরে করে একটু পা লাগিয়ে দাঁড়ালেন কিছুক্ষণ । আমি বললাম ‘বাবা ওটাকে নিয়ে যাব ?’ বাবা বললেন ‘না না, কারও বাড়ির পোষা এরা , দেবে কেন !’ মনটা খারাপ হয়ে গেল । বাড়িতে ফিরে মাকে কুকুর ছানার গল্প শোনালাম । সেই গল্পের প্রথম অধ্যায় হাসি মুখে আর শেষ অধ্যায় দুঃখী মুখে শুনিয়েছিলাম । বিকেলে হঠাৎ দেখি বাবা সেই সাদা তুলতুলে নরম বলের মতো কুকুর ছানাটাকে বাড়ি এনেছেন । সবার কি মজা । মা একটু কিন্তু কিন্তু করছিল কিন্তু আমাদের খুশিতে না খুশি হয়ে পারল না । যাদের কুকুর তাদের বাড়ি গিয়ে বাবা আমার জন্য নিয়ে এলেন । তারা খুশি হয়েই দিয়েছিল । দেশি কুকুর বলে খুব বেশি আদর ছিল না তাদের বাড়িতে। তাতে আমাদের কিছুই যায় আসে না । তখন আমাদের খুশির সীমা ছিল না । নতুন অতিথির জন্য বিশেষ ধরনের নতুন সাবান , পাওডার এলো । একটা কাঠের বাক্স এল , তাতে খড় বিছিয়ে পুরনো কাপড় দেওয়া হল । শীত কাল ঠাণ্ডা না লেগে যায় । সেটাতে তার ঘুমনোর ব্যাবস্থা । ঘরের কোনায় তার বিছানা্টা রাখা হল । পরের দিন চেন কেনা হল । ঠিক সময় করে তাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া হত । কিছু দিনের মধ্যে তাকে ভেটেনারি ডাক্তারের পরামর্শে  ইঞ্জেকশানও লাগানো হয়েছিল । তবে এসবের আগে যেটা হয়েছিল , সেটা হল নামকরণ । বাড়িতে নতুন আতিথি , তার নামকরণ হওয়া সব চেয়ে জরুরি ছিল । অনেক ভেবে বাবা নাম রাখলেন , ‘মোতি’ । আর সেদিন থেকে মোতি আমাদের পরিবারের এক সদস্য হয়ে গিয়েছিল ।

মোতি আসার দুই সপ্তাহ হয়েছে। এখন তাকে বাড়ি সামনের প্রাচীর ঘেরা খোলা জায়গায় খেলার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয় । সঙ্গে কেউ থাকে যেন সে রাস্তার দিকে চলে না যায় । ছোট্ট মোতি না বুঝে রাস্তায় চলে গেলে গাড়ি চাপা পড়তে পারে । নিদেন পক্ষে সাইকেলে ধাক্কা তো দেবেই । তাই তার পাহারায় কেউ না কেউ থাকেই । এতো সতর্কতার মধ্যেও সেদিন মোতি হারিয়ে গেল । বাড়ির আসে পাশে , পুরো পাড়া সব খুঁজে ফেলা হল । কিন্তু মোতিকে পাওয়া গেল না । চোখ ফেটে জল এলো । কান্না কিছুতেই থামে না আমার । তারই মধ্যে কেউ বলল , নদীর দিকে যাওয়ার রাস্তায় একটা ছোট্ট ছেলে একটা সাদা কুকুর নিয়ে যাচ্ছিল, যার গায়ে কালো ছোপ ও ছিল । কিন্তু তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে । শীত কালের বেলা, এমনিতেই ছোট । সেই অন্ধকারে নদীর রাস্তায় যাওয়া সম্ভব ছিল না । বাড়িতে মা আমি আর ভাই । বাবা তখনও ফেরেননি । আমরা বাবা আশার আপেক্ষা করতে লাগলাম । মা আমাদের পড়তে বসিয়ে দিলেন । কিছুক্ষণ পর পড়াতে দাদা (মাস্টার মশাই) এলো । পড়ায় কিছুতেই মন বসছিল না । বার বার খালি কাঠের বাক্সটার দিকে তাকাচ্ছিলাম । কান্না আসছিল । রাত আটটার দিকে বাবা বাড়ি ফিরলেন । কাঁদো কাঁদো মুখে আমি বাবাকে বললাম , বাবা, মোতি হারিয়ে গেছে । মা বলল , কোন বাচ্চা নিয়ে চলে গেছে । সঙ্গে সঙ্গে বাবা বেরিয়ে গেলেন সাইকেল নিয়ে । বাবা যখন ফিরলেন তখন রাত প্রায় দশটা বাজে । আমি খুব আশা করেছিলাম, বাবা মোতিকে ঠিক খুঁজে আনবেন । সাইকেলের শব্দ শুনে, তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিলাম । প্রথম প্রশ্ন , বাবা মোতি কোথায় ? বাবা বললেন , অনেক খুঁজেও মোতির কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি । কাল আর একবার খুঁজতে যাবেন । মনে হল বাবা মজা করছেন । বাবার আসে পাশে , পেছনে গিয়ে দেখলাম। মনে হল মোতি এসেছে, বাবা কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন । কিন্তু, হতাশ হলাম খুঁজে না পেয়ে । প্রায় মেনে নিচ্ছিলাম যে মোতি ফেরেনি, এমন সময় আমার চোখ গেল বাবার পেটের দিকে । বাবার পেটটা একটু বেশি মোটা লাগছে না ! সন্দেহ আর থাকলো না যখন দেখলাম, মোতির ছোট্ট ছোট্ট পা গুলো বাবার শীতের কোটের তলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে । সঙ্গে সঙ্গে বাবার কোটের জিপটা টেনে খুলে ফেললাম , আর মোতি মাটিতে নেমে কুই কুই করতে লাগলো । কোটের ভেতর সে বেশ আরামেই ছিল । মাটিতে নেমে সে ঠাণ্ডা বোধ করছিল । বাড়িতে খুশির ধুম পড়ে গেল । মোতি এসে গেছে , এখন তাকে নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামাচ্ছে না । আমি তাকে তুলে কাঠের বাক্সে শুইয়ে দিলাম । সবাই ব্যাস্ত এই জানতে যে , বাবা তাকে পেলেন কোথায় । বাবা শোনালেন আর এক গল্প । আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে, নদীর ওপারে একটা ছোট্ট বাজার মতো আছে , শীতের রাত বলে প্রায় সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে । এক দুটো দোকানে   জিজ্ঞেস করে তেমন কিছু জানা গেল না । তারি মধ্যে কেউ বলেছিল, সামনে মুসলমান বসতি , সেখানের কোন বাচ্চা নিয়েও আসতে পারে । এদিক সেদিক খুঁজেও যখন তিনিও আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন তখন এক মুসলমান ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “কুকুর ছানা? আমার ছেলে একটা সাদা কুকুর আজ বিকেলে কত্থেকে এনেছে , বলল কুড়িয়ে পেয়েছে । আপনি দাঁড়ান আমি নিয়ে আসছি ।” ভদ্রলোক কুকুরের সাথে তাঁর ছেলে কেও নিয়ে এলেন আর তাকে মারতে শুরু করলেন । বাবা কোন রকমে তাকে থামিয়েছিলেন । তিনি বলেছিলেন ‘না মারলে আবার কারো বাড়ির জিনিস নিয়ে আসবে , না বলে’ । সে শীতের সন্ধ্যার কথা আজও আমার মনে পড়ে ।

এর পর মোতি বড় হল । বেশ সুন্দরি ছিল সে । গায়ের লোম মসৃণ  চকচকে ছিল । মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে থাকত সে । তাকে আর চেন দিয়ে বেঁধে রাখা হতো না । সে ঘরের আসে পাশেই থাকতো । দিনের বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটাত । খাওয়ার সময় খেত । মা বলত, ‘যেমন বাড়ির তেমন কুকুর । এ বাড়ির সবাই অলস’ । এর মধ্যে সে আমাকে একবার ভয় পেয়ে কামড়েও ছিল । প্রতি বছর মোতির ছোট ছোট ছানা হত । তাদের অনেকেই নিয়ে যেত । আমাদের সাথে হোলি খেলত, আর রং মেখে ফটোও তুলত মোতি । প্রায় নয় বছর আমাদের পরিবারের একজন হয়ে ছিল সে । তখন আমি হস্টেলে চলে গেছি । একদিন সন্ধ্যায় মায়ের সাথে কথা বলার জন্য ফোন করেছিলাম , তখন মা জানিয়েছিল মোতি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে । হু হু করে কেঁদে ছিলাম সেদিন । মনে হচ্ছিল আমি আমার কতো প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলেছি , বাড়ি ফিরে যাকে আর কোন দিন দেখতে পাবো না । বাড়ির গেট থেকে আমাকে লেজ নেড়ে সে ভেতরে নিয়ে যাবে না , বাস স্ট্যান্ডে ছাড়তে আসবে না , শান্ত দু চোখ মেলে সব কথা বুঝে যাবে না । বাইরের বিড়াল ঘরে এলে তাকে না তাড়িয়ে, অলস ভাবে শুয়ে থাকার জন্য মা আর কাউকে বকবে না । আমাদের বাড়িতে মোতি বলে আর কাউকে ডাকা হবে না । আর ভুল করে ডাকলেও কেউ চুপ চুপ এসে পেছনে দাঁড়াবে না । মা আভিমানে বলবে না ‘সাড়া দিতে পারছিস না !’ । সে যে অনেক দুরে চলে গেছে, যতই কষ্ট হোক, বাবা এবার আর কিছুতেই তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন না ।
        
 Moumita Sahu
29/02/2016, Bangalore